Showing posts with label ghar jamai apobad. Show all posts
Showing posts with label ghar jamai apobad. Show all posts

Tuesday, 15 April 2014

‘ঘরজামাই’ এখনো অপবাদ!

স্বস্তি, নিরাপত্তা ও দায়িত্ববোধের পরিচয় মিললে অপবাদে কী যায়-আসে? মডেল হয়েছেন শিরীন বকুল, জিনিয়া, টিয়ারা ও শামস। ছবি: কবির হোসেনস্বস্তি, নিরাপত্তা ও দায়িত্ববোধের পরিচয় মিললে অপবাদে কী যায়-আসে? মডেল হয়েছেন শিরীন বকুল, জিনিয়া, টিয়ারা ও শামস। ছবি: কবির হোসেনমেয়েরা এখন অনেক দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্ব শেষ হয় না বিয়ের পরও। মা-বাবা বৃদ্ধ, একা থাকেন। কিংবা সন্তান ছোট। তাকে দেখার কেউ নেই। তখন মেয়েটি তাঁর স্বামীসহ নিজের মা-বাবার কাছে থাকেন। মেয়েটির উপকার হলেও লোকে স্বামীকে ‘ঘরজামাই’ অপবাদ দিতে ছাড়ে না। তাহলে কি আসলেই সমাজ বদলেছে?
‘আমরা চার বোন, বাবা মারা গেছেন ছোটবেলাতেই। বড় তিন বোন বিয়ে করে চলে গেছেন আলাদা সংসারে। মা একা। আমার বিয়ের সময়ই মা বলে রেখেছিলেন, যেন আমি স্বামীসহ তাঁর সঙ্গেই থাকি। এতে আমার চাচারা খুব নিশ্চিন্ত হয়ে গেলেন, কারণ তাঁদের আর বড় ভাইয়ের বিধবা স্ত্রীর খোঁজখবর রাখতে হচ্ছিল না। এদিকে আমার বড় বোনেরাও আমার ওপর মায়ের দায়িত্ব চাপিয়ে খালাস। মায়ের কোনো কিছু হলেই ওঁরা আমার স্বামীকে বলতেন, “তুমি থাকতে এটা কেন হলো, ওটা কেন হলো?” মোহাম্মদপুরের স্বর্ণা বলছিলেন নিজের অভিজ্ঞতার কথা। তিনি আরও জানালেন, আর অন্য আত্মীয়স্বজনেরাও আড়ালে-আবডালে আমার স্বামীকে নিয়ে বাঁকা কথা বলতে ছাড়তেন না। প্রতিবেশীদের কেউ কেউ অনেক সময় করুণার সুরে আমাকে বলতেন, “ও, তুমি মায়ের বাড়িতে থাকো।” একদিকে মাকে ছেড়ে যেতেও পারছি না, অন্যদিকে এসব এমন বাঁকা কথাবার্তাও সহ্য হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত আলাদা ফ্ল্যাট কিনে মাকে আমার কাছে নিয়ে এলাম। মাকে বললাম, “ঘরজামাই” থাকা সমস্যা কিন্তু “ঘরশাশুড়ি” হলে তো আর অসুবিধা নেই। এখন চাচারাও মায়ের খোঁজখবর করেন, আবার অন্য বোনেরাও মাকে মাঝেমধ্যে নিজেদের কাছে নিয়ে রাখেন। মানুষের ইঙ্গিতপূর্ণ কথাবার্তাও শুনতে হয় না।’
.বিয়ের পর মেয়েরা স্বামীর বাড়ি চলে যাবেন, এটাই আমাদের সমাজে বহুকাল ধরে চলে আসা সাধারণ নিয়ম। আর সেই নিয়ম ভেঙে যদি বিয়ের পর মেয়ের স্বামী শ্বশুরবাড়িতে এসে থাকেন, তবে তাঁকে বলা হয় ‘ঘরজামাই’। আর ঘরজামাই শুনলেই মনে হয়—বেকার, শ্বশুরবাড়ির ওপর নির্ভরশীল।
তবে সময় পাল্টাচ্ছে। প্রয়োজনের তাগিদে অনেক মেয়ে তাঁর স্বামীসহ এখন থাকছেন বাবার বাড়িতে। বিশেষ করে চাকরিজীবী দম্পতিকে সন্তান লালনপালনের জন্য অনেক সময় নির্ভর করতে হয় শাশুড়ির ওপর। সে ক্ষেত্রে, শ্বশুরবাড়িতে থাকার বিকল্প নেই। আবার এমনও দেখা গেছে, বৃদ্ধ মা-বাবাকে দেখাশোনার কেউ নেই, তাঁদের দেখভালের জন্য মেয়ে আর জামাইকেই সঙ্গে থাকতে হচ্ছে। এখনও সমাজে এ বিষয়টিকে খোলা মনে সবাই মেনে নিতে পারেন না। তেমনটা বললেন মাজেদা খাতুন।
‘আমার ছোট মেয়ে আর জামাই থাকে আমার সঙ্গে। যদিও জামাইয়ের সেটা অপছন্দ, ও তো এ বাসায় একদম থাকতেই চায় না, অনেকটা বাধ্য হয়ে থাকছে। আসলে ওরা দুজনই চাকরি করে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অফিস, বাচ্চাটা ছোট, ওকে দেখাশোনা করার কেউ নেই, তাই বাচ্চাকে আমার কাছে রেখে ওরা যে যার কাজ করে।’ কিছুটা কুণ্ঠার সঙ্গেই, যেন মেয়ে আর জামাইয়ের পক্ষে বললেন মাজেদা খাতুন। ‘বাচ্চাটা আরেকটু বড় হয়ে গেলেই হয়তো আর এই বাসায় থাকবে না ওরা।’
আমাদের সমাজে এখনো বেশির ভাগ পুরুষ মনে করেন, শ্বশুরবাড়িতে থাকলে আত্মসম্মান বা আত্মমর্যাদা নিয়ে থাকা যায় না। সমাজেও ‘অকর্মণ্য’ বলে অপবাদ জোটে। তবে এর ব্যতিক্রমও আছে। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আসাদ আহমেদ কোনো রকম রাখঢাক ছাড়াই মজা করে বলেন, ‘আমি ভাই, ঘরজামাই।’ আসাদ আহমেদের স্ত্রী সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। তিনি তাঁর মা-বাবার একমাত্র মেয়ে। মা মারা গেছেন আগেই। বাবা যেমন মেয়েকে কাছ-ছাড়া করতে চান না। তেমনি মেয়েও বিপত্নীক বাবাকে একা ছেড়ে যেতে নারাজ। ফলে, আসাদ আহমেদ স্ত্রী, নিজের ছেলেমেয়ে নিয়ে শ্বশুরের সঙ্গেই থাকেন। এই একত্র-বাস নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে কোনো রকম হীনন্মন্যতায় ভোগেন না।
অনেক শ্বশুর-শাশুড়িই জামাইকে ছেলের মর্যাদা দেন, আবার জামাইও শ্বশুর-শাশুড়িকে নিজের মা-বাবার মতোই শ্রদ্ধা, সম্মান ও যত্ন-আত্তি করেন। যেসব পরিবারে ছেলে নেই, সেসব পরিবারের মা-বাবা অনেক সময় হয়তো নিজেদের প্রয়োজনেই মেয়ে-জামাইকে কাছে রাখতে চান। আবার সন্তান লালনপালনের জন্য অনেক মেয়েই মা-বাবার সংসারে থাকাটাকে দরকারি বলে মনে করেন। আজকাল তো একই ফ্ল্যাটের ওপর-নিচে মা-বাবা এবং মেয়ে ও জামাইয়ের সহাবস্থান দেখা যায়। এ নিয়ে সমাজেও খুব একটা নেতিবাচক মনোভাব নেই।
এ বিষয়ে সমাজবিজ্ঞানী মাহবুবা নাসরীন বলেন, ঘরজামাই নিয়ে সমাজের প্রচলিত ধারণা হয়তো রাতারাতি বদলাবে না। তবে যতই দিন যাচ্ছে, ততই প্রয়োজনের তাগিদে পাল্টাচ্ছে অনেক মূল্যবোধ, ধ্যান-ধারণা। সেই পরিবর্তনের স্রোতেই হয়তো একসময় পাল্টে যাবে ‘ঘরজামাই’ নিয়ে সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি।
আসল কথা হলো, পরিবারের মেয়ে এখন আগের চেয়ে অনেক দায়িত্বশীল। মা বা বাবার দায়িত্ব মেয়েরা এড়াতে পারেন না। সঙ্গীর মা-বাবা নিজের মা-বাবা ভাবলে দেখবেন, নিজেকে আর ‘ঘরজামাই’ মনে হচ্ছে না, ওই বাড়ির ছেলেই মনে হচ্ছে। পাছে লোকে কী বলল, সেসব কথায় কান না দিলেই ভালো।